খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ই জানুয়ারি ২০১৫, ১২:১২ পিএম
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে মধুমতী নদী বিধৌত গোপালগঞ্জ জেলা কৃষিতে অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি জনপদ। গাঙ্গেয় প্লাবনভূমি এবং বিস্তীর্ণ বিল অঞ্চলের সমন্বয়ে গঠিত এই জেলার ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য একে অনন্য একটি কৃষি প্রতিবেশ অঞ্চলে (Agro-Ecological Zone) পরিণত করেছে। উর্বর পলিমাটি, পর্যাপ্ত বার্ষিক বৃষ্টিপাত এবং কৃষিজীবী মানুষের নিরলস পরিশ্রমে গোপালগঞ্জ বর্তমানে একটি খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা হিসেবে জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
কৃষিবিজ্ঞান ও মৃত্তিকা ব্যবস্থাপনার দৃষ্টিকোণ থেকে গোপালগঞ্জ জেলার কৃষিব্যবস্থার বিস্তারিত পরিসংখ্যান, কৃষকের আর্থ-সামাজিক অবস্থা, জমির ব্যবহার এবং ফসল উৎপাদনের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ নিচে ধারাবাহিকভাবে আলোচনা করা হলো।

গোপালগঞ্জ জেলার কৃষিব্যবস্থা একটি সুসংগঠিত কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ব্লকভিত্তিক কার্যক্রম প্রান্তিক কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদে সহায়তা করে।
গুরুত্বপূর্ণ নোট: বাৎসরিক ৫,৯৬৬ মি.মি. বৃষ্টিপাত নির্দেশ করে যে, এই অঞ্চলটি অত্যন্ত বৃষ্টিবহুল। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত আমন ধান ও পাট চাষের জন্য উপকারী হলেও, উপযুক্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকলে রবি শস্যের জন্য তা ক্ষতিকর হতে পারে।
যেকোনো অঞ্চলের কৃষি উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলেন সে অঞ্চলের কৃষকরা। জমির মালিকানার ভিত্তিতে গোপালগঞ্জ জেলার কৃষকদের বিন্যাস প্রমাণ করে যে, এই জেলার কৃষি মূলত ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের ওপর নির্ভরশীল।
সারণি ১: গোপালগঞ্জ জেলার কৃষকদের শ্রেণিবিভাগ
| কৃষকের ধরন | সংখ্যা (জন) | কৃষি অর্থনীতিতে প্রভাব |
| ক্ষুদ্র কৃষক | ৩৫,০৪৩ | জেলার মোট কৃষি উৎপাদনের সিংহভাগ এদের হাতেই সম্পন্ন হয়। |
| বড় কৃষক | ৯,১২৬ | বাণিজ্যিক কৃষি ও যান্ত্রিকীকরণে এদের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। |
| অশ্রেণিভুক্ত | ৮,৯২৬ | অনিয়মিত বা মিশ্র পেশায় যুক্ত কৃষিজীবী। |
| প্রান্তিক কৃষক | ৭,৩৯৫ | অত্যন্ত সীমিত জমি থাকায় মূলত অন্যের জমিতে বা বর্গা চাষ করেন। |
| মাঝারি কৃষক | ৬,০৭৬ | নিজেদের চাহিদা মিটিয়ে বাজারে খাদ্য সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। |
| ভূমিহীন কৃষক | ৩,৫৩৩ | নিজস্ব কৃষিজমি নেই, মূলত কৃষিশ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। |
গোপালগঞ্জ জেলার অধিকাংশ এলাকা গাঙ্গেয় নিম্ন প্লাবনভূমি (AEZ-12) এবং গোপালগঞ্জ-খুলনা বিল অঞ্চলের (AEZ-14) অন্তর্গত। সরকারি রেকর্ডে উল্লিখিত ১২১৪৩১ নম্বরটি মূলত এই সুনির্দিষ্ট কৃষি প্রতিবেশ অঞ্চলগুলোর সমন্বিত নির্দেশক।
ভূমিরূপ ও উচ্চতার ভিত্তিতে জেলার জমির বিন্যাস অত্যন্ত বৈচিত্র্যময়:
মাটির গঠনগত বৈশিষ্ট্য:
ফসল নির্বাচনের ক্ষেত্রে মাটির বুনট (Soil Texture) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ জেলায় বেলে দোআঁশ মাটির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি (৪,৬৮৫ হেক্টর), যা শাকসবজি, ডাল ও তেলজাতীয় ফসলের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এছাড়া এঁটেল দোআঁশ (২,৮৪৯ হেক্টর), দোআঁশ (১,২৬৪ হেক্টর), এঁটেল (১,০৮৭ হেক্টর) এবং বেলে মাটির (১,০৫০ হেক্টর) উপস্থিতিও রয়েছে।
গোপালগঞ্জের নিচু ও জলাবদ্ধ জমিগুলো আধুনিক ভাসমান কৃষি (ধাপ চাষ) এবং ধানের গভীর জলের জাত (Deep-water rice) চাষের জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত। ফসল উৎপাদনের তীব্রতার ভিত্তিতে জমির ব্যবহার নিম্নরূপ:
বৈজ্ঞানিক সংশোধন ও বিশ্লেষণ (শস্য নিবিড়তা): প্রচলিত তথ্যে শস্য নিবিড়তা (Cropping Intensity) ৭০৫% উল্লেখ থাকলেও, কৃষিবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী তা গাণিতিকভাবে অসম্ভব। এক ফসলী, দুই ফসলী ও অন্যান্য জমির পরিমাণ হিসাব করলে (মোট ফসলী জমি ÷ নিট আবাদি জমি × ১০০) গোপালগঞ্জ জেলার প্রকৃত শস্য নিবিড়তা দাঁড়ায় প্রায় ১৬৩%। এটি প্রমাণ করে যে, এই জেলায় একই জমিতে বছরে একাধিক ফসল ফলানোর প্রবণতা অত্যন্ত ইতিবাচক পর্যায়ে রয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তার মানদণ্ডে গোপালগঞ্জ একটি অত্যন্ত সফল জেলা। জেলার নিজস্ব চাহিদা মিটিয়ে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ করা হয়।
সারণি ২: বার্ষিক খাদ্য পরিস্থিতি
| বিবরণ | পরিমাণ (মেট্রিক টন) |
| মোট খাদ্য উৎপাদন | ২,৮৮,২২২ |
| মোট খাদ্য চাহিদা | ১,৭০,৩১৬ |
| বীজ, গোখাদ্য ও অন্যান্য অপচয় | ২১,৯১৮ |
| মোট খাদ্য ঘাটতি | ০ (শূন্য) |
| মোট খাদ্য উদ্বৃত্ত | ১,১১,৭৪৭ |
বিশ্লেষণ: শূন্য খাদ্য ঘাটতি এবং ১ লাখ ১১ হাজার মেট্রিক টনের বেশি উদ্বৃত্ত প্রমাণ করে যে গোপালগঞ্জ জেলার কৃষিব্যবস্থা অত্যন্ত টেকসই।
কৃষিকাজ প্রসারের জন্য সেচ, জলাশয় এবং সংরক্ষণাগার অত্যন্ত জরুরি।
সতর্কতা ও সুপারিশ: হিমাগারের অভাব কৃষিখাতে এই জেলার সবচেয়ে বড় দুর্বলতা। কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় কৃষকরা উদ্বৃত্ত শাকসবজি ও পচনশীল পণ্য সংরক্ষণ করতে পারেন না, ফলে ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হন। দ্রুত সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে হিমাগার স্থাপন জরুরি।
গোপালগঞ্জে ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি নার্সারি ও ফলজ বাগান সৃজনের কাজও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। জেলায় বর্তমানে ২৫টি নার্সারি এবং ২২৮টি স্থায়ী ফলবাগান রয়েছে।
১. গোপালগঞ্জ জেলার কৃষিতে কোন শ্রেণির কৃষকের আধিপত্য সবচেয়ে বেশি?
গোপালগঞ্জ জেলায় ক্ষুদ্র কৃষকদের আধিপত্য সবচেয়ে বেশি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলায় প্রায় ৩৫,০৪৩ জন ক্ষুদ্র কৃষক রয়েছেন, যারা মোট কৃষি উৎপাদনে প্রধান ভূমিকা পালন করেন।
২. গোপালগঞ্জ কি খাদ্য ঘাটতি নাকি খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা?
গোপালগঞ্জ একটি খাদ্য উদ্বৃত্ত জেলা। এখানে বার্ষিক উৎপাদনের পর প্রায় ১,১১,৭৪৭ মেট্রিক টন খাদ্য উদ্বৃত্ত থাকে এবং জেলায় কোনো খাদ্য ঘাটতি নেই।
৩. গোপালগঞ্জ জেলার মাটির প্রধান বৈশিষ্ট্য কী?
গোপালগঞ্জের মাটি মূলত গাঙ্গেয় প্লাবনভূমির পলি দ্বারা গঠিত। এর মধ্যে বেলে দোআঁশ ও এঁটেল দোআঁশ মাটির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি, যা প্রায় সকল ধরনের ফসল চাষের উপযোগী।
৪. জেলার কৃষি সম্প্রসারণে প্রধান বাধা কোনটি?
কৃষি সম্প্রসারণ ও কৃষকের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তিতে প্রধান বাধা হলো জেলায় কোনো কোল্ড স্টোরেজ বা হিমাগার না থাকা।
৫. গোপালগঞ্জ জেলায় জলাবদ্ধ বা অতি নিচু জমির পরিমাণ কত?
এই জেলায় ১৪,৫০৮ হেক্টর অতি নিচু জমি এবং ১১,৫৬৭ হেক্টর সারা বছর বা সাময়িক জলাবদ্ধ এলাকা রয়েছে, যেখানে ভাসমান কৃষি ও গভীর জলের ধান চাষ করা হয়।

মন্তব্য