খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ই জানুয়ারি ২০১৫, ৬:২৩ পিএম
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি ঐতিহ্যবাহী ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ জনপদ হলো গোপালগঞ্জ। প্রমত্তা মধুমতী নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এই জেলার রয়েছে এক দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাস। প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলাদেশের অভ্যুদয় পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে গোপালগঞ্জের ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক বিবর্তন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার ফসল। প্রাচীনকালে এই অঞ্চলটি বৃহত্তর ‘বঙ্গ’ জনপদের অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে সুলতানি ও মোঘল শাসনামলে স্থানীয় হিন্দু রাজাদের অধীনে এই এলাকার শাসনভার পরিচালিত হতো।
বর্তমান গোপালগঞ্জ জেলা একদিনে গড়ে ওঠেনি। ব্রিটিশ আমলের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত থেকে শুরু করে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় মহকুমা এবং অবশেষে একটি পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে গোপালগঞ্জের আত্মপ্রকাশ ঘটে।

ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে ১৭৯৩ সালের ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ (Permanent Settlement) এই অঞ্চলের ভূমি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। সেই সময়ে বর্তমান গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলা ছিল যশোর জেলার অন্তর্গত। অন্যদিকে গোপালগঞ্জ সদর ও কোটালীপাড়া অঞ্চল বৃহত্তর ঢাকা-জালালপুর জেলার একটি পরগনা (জালালপুর) হিসেবে শাসিত হতো।
১৮০৭ সাল: প্রশাসনিক সুবিধার জন্য মুকসুদপুর থানাকে যশোর জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফরিদপুর জেলার সাথে সংযুক্ত করা হয়।
১৮১২ সাল: চান্দনা (যা বর্তমানে মধুমতী নামে পরিচিত) নদীকে যশোর এবং ঢাকা-জালালপুর জেলার প্রাকৃতিক বিভাজক রেখা বা সীমানা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
১৮৫৪ সাল: তৎকালীন গোপালগঞ্জ ও মাদারীপুর অঞ্চল ছিল বিস্তীর্ণ বিল ও জলাভূমি বেষ্টিত। দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এই অঞ্চলে নৌ-ডাকাতির প্রকোপ চরম আকার ধারণ করেছিল। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্রিটিশ সরকার ১৮৫৪ সালে বাকেরগঞ্জ (বর্তমান বরিশাল) জেলা থেকে বিচ্ছিন্ন করে মাদারীপুরকে একটি নতুন মহকুমা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
১৮৭২-১৮৭৩ সাল: ১৮৭২ সালে মাদারীপুর মহকুমার অধীনে ‘গোপালগঞ্জ’ নামে একটি নতুন থানা গঠিত হয়। এর ঠিক এক বছর পর, ১৮৭৩ সালে মাদারীপুর মহকুমাকে বাকেরগঞ্জ থেকে সরিয়ে ফরিদপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
প্রশাসনিক কাজের বিকেন্দ্রীকরণ এবং স্থানীয় জনগণের সুবিধার কথা বিবেচনা করে ১৯০৯ সালে মাদারীপুর মহকুমাকে ভেঙে ‘গোপালগঞ্জ মহকুমা’ গঠন করা হয়। নবগঠিত এই মহকুমায় গোপালগঞ্জ সদর ও কোটালীপাড়া থানার পাশাপাশি ফরিদপুর মহকুমা থেকে মুকসুদপুর থানাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
গোপালগঞ্জ মহকুমার প্রথম মহকুমা প্রশাসক (SDO) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন শ্রী সুরেশ চন্দ্র সেন। তার সময়েই এই অঞ্চলের প্রশাসনিক কাঠামোর আধুনিকায়ন শুরু হয়।
বিংশ শতাব্দীর শুরুতে গোপালগঞ্জে বিচার ব্যবস্থা ও নগরকেন্দ্রিক সুবিধার প্রসার ঘটতে থাকে। ১৯১০ সালে মহকুমা প্রশাসকের অধীনে থাকা বেঞ্চ কোর্টকে (Bench Court) আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ফৌজদারি কোর্ট’ বা ক্রিমিনাল কোর্টে উন্নীত করা হয়।
১৯২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, তৎকালীন গোপালগঞ্জ শহরের মোট জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৩,৪৭৮ জন। জনসংখ্যা কম হলেও কৌশলগত কারণে ১৯২১ সালে গোপালগঞ্জকে আনুষ্ঠানিকভাবে শহর (Town) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পরবর্তীতে দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ১৯২৫ সালে এখানে সিভিল কোর্ট বা দেওয়ানি আদালত চালু করা হয়, যা প্রশাসনিক বিচার ব্যবস্থায় একটি বড় মাইলফলক।
সময়ের সাথে সাথে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও প্রশাসনিক পরিধি সম্প্রসারিত হওয়ায় নতুন নতুন থানা গঠিত হতে থাকে।
১৯৩৬ সাল: মুকসুদপুর থানাকে বিভক্ত করে ‘কাশিয়ানী’ নামে একটি নতুন থানা প্রতিষ্ঠা করা হয়।
১৯৭৪ সাল: স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মস্থান টুঙ্গিপাড়ার প্রশাসনিক গুরুত্ব বিবেচনা করে গোপালগঞ্জ সদর থানাকে ভেঙে ‘টুঙ্গিপাড়া থানা’ গঠন করা হয়।
১৯৮৪ সাল: বাংলাদেশের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ নীতির আওতায় ১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি গোপালগঞ্জ মহকুমাকে একটি পূর্ণাঙ্গ জেলায় উন্নীত করা হয়।
গোপালগঞ্জ জেলার প্রথম জেলা প্রশাসক (DC) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন জনাব এ. এফ. এম. এহিয়া চৌধুরী।
বর্তমানে গোপালগঞ্জ জেলা একটি সুসংগঠিত প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর প্রতিষ্ঠিত। সরকারি সেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে জেলা প্রশাসন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
সারণি ১: গোপালগঞ্জ জেলার বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো
| প্রশাসনিক ইউনিট | সংখ্যা | বিবরণ |
| উপজেলা | ০৫ টি | গোপালগঞ্জ সদর, টুঙ্গিপাড়া, কোটালীপাড়া, কাশিয়ানী ও মুকসুদপুর |
| পৌরসভা | ০৪ টি | গোপালগঞ্জ, টুঙ্গিপাড়া, কোটালীপাড়া ও মুকসুদপুর |
| ইউনিয়ন | ৬৮ টি | সমগ্র জেলায় বিস্তৃত গ্রামীণ স্থানীয় সরকার স্তর |
| মৌজা | ৬৫৩ টি | ভূমি জরিপ ও রাজস্ব আদায়ের সর্বনিম্ন একক |
গোপালগঞ্জ জেলার ভৌগোলিক অবস্থান একে দক্ষিণবঙ্গের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
উত্তরে: ফরিদপুর জেলা।
দক্ষিণে: পিরোজপুর ও বাগেরহাট জেলা।
পূর্বে: মাদারীপুর ও বরিশাল জেলা।
পশ্চিমে: নড়াইল জেলা।
ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে গোপালগঞ্জ অত্যন্ত সমৃদ্ধ। এখানে রয়েছে ব্রিটিশ আমল ও তার পূর্ববর্তী সময়ের বহু ঐতিহাসিক নিদর্শন। এর মধ্যে অন্যতম হলো ওড়াকান্দির পাগল সেবাশ্রম, যা মতুয়া সম্প্রদায়ের একটি পবিত্র তীর্থস্থান। এছাড়া কোটালীপাড়ায় অবস্থিত প্রখ্যাত মার্কসবাদী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের পৈত্রিক বাড়ি এ জেলার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের এক অমূল্য স্মারক।
১. গোপালগঞ্জ মহকুমা কবে গঠিত হয়?
১৯০৯ সালে মাদারীপুর মহকুমাকে ভেঙে আনুষ্ঠানিকভাবে গোপালগঞ্জ মহকুমা গঠন করা হয়।
২. গোপালগঞ্জ কবে পূর্ণাঙ্গ জেলার মর্যাদা পায়?
১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারি প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে গোপালগঞ্জ মহকুমা একটি পূর্ণাঙ্গ জেলায় উন্নীত হয়।
৩. গোপালগঞ্জ জেলার প্রথম জেলা প্রশাসক কে ছিলেন?
গোপালগঞ্জ জেলার প্রথম জেলা প্রশাসক (DC) ছিলেন জনাব এ. এফ. এম. এহিয়া চৌধুরী।
৪. ব্রিটিশ আমলে গোপালগঞ্জে মহকুমা গঠনের প্রধান কারণ কী ছিল?
বিস্তীর্ণ বিল ও জলাভূমি বেষ্টিত এই অঞ্চলে যাতায়াত ব্যবস্থা দুর্গম থাকায় নৌ-ডাকাতির প্রকোপ খুব বেশি ছিল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের জন্যই মূলত মাদারীপুর ও পরবর্তীতে গোপালগঞ্জ মহকুমা গঠন করা হয়।
৫. বর্তমানে গোপালগঞ্জ জেলায় কতটি উপজেলা রয়েছে?
বর্তমানে গোপালগঞ্জ জেলায় ৫টি উপজেলা রয়েছে—গোপালগঞ্জ সদর, টুঙ্গিপাড়া, কোটালীপাড়া, কাশিয়ানী এবং মুকসুদপুর।

মন্তব্য