খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৮ই জানুয়ারি ২০১৫, ১২:০ পিএম
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রমত্তা মধুমতী নদীর অববাহিকায় গড়ে ওঠা এক ঐতিহ্যবাহী জনপদ হলো গোপালগঞ্জ। ঢাকা বিভাগের অন্তর্গত ১৩টি জেলার মধ্যে অন্যতম এই জেলাটি কেবল ভৌগোলিক দিক থেকেই নয়, বরং ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। প্রাচীন জনবসতি, জমিদার প্রথা, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়—প্রতিটি পর্যায়ে গোপালগঞ্জের রয়েছে এক সমৃদ্ধ ও বর্ণাঢ্য ইতিহাস।

গোপালগঞ্জ শহরের প্রাচীন নাম ছিল ‘রাজগঞ্জ’। এই অঞ্চলটির নামকরণের পেছনে জমিদার প্রথা ও স্থানীয় কিংবদন্তির গভীর সংযোগ রয়েছে।
ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে গোপালগঞ্জ অঞ্চলটি বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার একটি মহকুমা ছিল। সে সময় এই এলাকাটি মাকিমপুর এস্টেটের (Makimpur Estate) অন্তর্ভুক্ত ছিল, যার দায়িত্বে ছিলেন প্রখ্যাত জমিদার রানি রাসমণি। ঐতিহাসিক সূত্র ও স্থানীয় লোককথা অনুযায়ী, রানি রাসমণি জন্মসূত্রে এক জেলের কন্যা ছিলেন। কথিত আছে, সিপাহী বিদ্রোহের (১৮৫৭) উত্তাল সময়ে তিনি এক ইংরেজ সাহেবের প্রাণ রক্ষা করেছিলেন। এর স্বীকৃতিস্বরূপ ব্রিটিশ সরকার তাকে মাকিমপুর অঞ্চলের বিশাল জমিদারি উপহার দেয়।
পরবর্তীতে রানি রাসমণি তার আদরের নাতি ‘গোপাল’-এর নামানুসারে প্রাচীন রাজগঞ্জ এলাকার নাম পরিবর্তন করে ‘গোপালগঞ্জ’ রাখেন। সেই থেকে এই অঞ্চলটি গোপালগঞ্জ নামেই পরিচিতি লাভ করে এবং কালের পরিক্রমায় একটি পূর্ণাঙ্গ জেলায় রূপান্তরিত হয়।
গোপালগঞ্জের প্রাচীন ইতিহাস বেশ পুরোনো। ঐতিহাসিকদের মতে, এই জেলার পূর্ব সীমানায় অবস্থিত খাটরা গ্রামে সর্বপ্রথম হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা বসতি স্থাপন শুরু করেন।
গুরুত্বপূর্ণ নোট: ধারণা করা হয়, খাটরা গ্রামে জনবসতি গড়ে ওঠার এই ঘটনাটি বাংলার সেন রাজবংশের পরাক্রমশালী শাসক বল্লাল সেনের শাসনামলে (১১০৯-১১৭৯ খ্রিষ্টাব্দ) ঘটেছিল। এটি প্রমাণ করে যে, দ্বাদশ শতাব্দী থেকেই এই অঞ্চলে সভ্যতার বিকাশ শুরু হয়েছিল।
ভৌগোলিক দিক থেকে গোপালগঞ্জ জেলা ২৩°৩৬’ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯°৫১’ পূর্ব দ্রাঘিমাংশের মধ্যে অবস্থিত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এই জেলার গড় উচ্চতা মাত্র ৪৬ ফুট, যা এর নদীবিধৌত সমভূমি ও নিচু জলাভূমি (বিল) থাকার বৈশিষ্ট্যকে স্পষ্ট করে।
গোপালগঞ্জ জেলার সীমানা রূপরেখা:
| দিক | সীমান্তবর্তী জেলা |
| উত্তরে | ফরিদপুর জেলা |
| দক্ষিণে | পিরোজপুর ও বাগেরহাট জেলা |
| পূর্বে | মাদারীপুর ও বরিশাল জেলা |
| পশ্চিমে | নড়াইল জেলা |
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, গোপালগঞ্জ জেলার মোট আয়তন ১,৪৮৯ বর্গ কিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায় ১১ লাখ। জনসংখ্যার নারী-পুরুষের অনুপাত এই জেলায় প্রায় সমান, যা একটি সুষম জনমিতিক কাঠামোর নির্দেশক।
গোপালগঞ্জ জেলা আবহমান কাল ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য উদাহরণ। এখানকার ধর্মীয় জনসংখ্যার পরিসংখ্যান নিম্নরূপ:
মুসলমান: ৭৩.৬২%
হিন্দু: ২৫.১৩%
খ্রিষ্টান: ১.২০%
অন্যান্য: ০.০২%
শিক্ষার ক্ষেত্রে এই জেলার গড় সাক্ষরতার হার ৫৮.১% (২০১১ শুমারি অনুযায়ী)। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠায় এই হার বর্তমানে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
গোপালগঞ্জের গ্রামীণ অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হলো কৃষি। মধুমতী, কুমার ও ঘাঘর নদীর পলিমাটি দ্বারা গঠিত হওয়ায় এখানকার ভূমি অত্যন্ত উর্বর।
প্রধান ফসল: ধান, পাট, আখ ও চিনাবাদাম।
প্রধান রপ্তানি পণ্য: জেলার উৎপাদিত উন্নত মানের পাট এবং তরমুজ দেশের বিভিন্ন স্থানে রপ্তানি করা হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখে।
টিপস বক্স (Tip Box): পরিবেশগত পরিবর্তন ও আধুনিক উচ্চফলনশীল জাতের আগ্রাসনে গোপালগঞ্জ থেকে বেশ কিছু ঐতিহ্যবাহী দেশীয় ফসল আজ বিলুপ্তির পথে। এর মধ্যে চিনা, কাউন এবং আউশ ধান অন্যতম। কৃষি জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এই জাতগুলোর বীজ সংরক্ষণ করা জরুরি।
গোপালগঞ্জ জেলায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে প্রাচীন বাংলার স্থাপত্যকলা ও আধ্যাত্মিক সাধনার নানা নিদর্শন। পর্যটক ও ইতিহাস অন্বেষণকারীদের জন্য জেলার উল্লেখযোগ্য স্থানগুলো হলো:
১. চন্দ্রবর্মা ফোর্ট (কোটাল দুর্গ): প্রাচীন বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন।
২. বহলতলী মসজিদ: ১৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত এই মসজিদটি সুলতানি আমলের স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
৩. শ্রীধাম ওড়াকান্দি: মতুয়া সম্প্রদায়ের পবিত্র তীর্থস্থান এবং শ্রী হরিমন্দির এখানেই অবস্থিত।
৪. ননীক্ষীরের নবরত্ন মন্দির: হিন্দু স্থাপত্যকলার এক অপূর্ব নিদর্শন।
৫. সেন্ট মথুরনাথ এজি চার্চ: খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের প্রাচীন উপাসনালয়।
৬. অন্যান্য স্থান: কোর্ট মসজিদ, কেন্দ্রীয় কালীবাড়ি এবং দীঘলিয়া দক্ষিণা কালীবাড়ি স্থানীয় মানুষের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
১. গোপালগঞ্জ জেলার পূর্বনাম কী ছিল?
গোপালগঞ্জ জেলার প্রাচীন নাম ছিল ‘রাজগঞ্জ’। রানি রাসমণি তার নাতি গোপালের নামানুসারে এর নামকরণ করেন গোপালগঞ্জ।
২. গোপালগঞ্জ জেলার মোট আয়তন ও জনসংখ্যা কত?
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, গোপালগঞ্জ জেলার আয়তন ১,৪৮৯ বর্গ কিলোমিটার এবং মোট জনসংখ্যা প্রায় ১১ লাখ।
৩. গোপালগঞ্জে প্রাচীন জনবসতি কবে গড়ে ওঠে বলে ধারণা করা হয়?
জেলার পূর্ব সীমানার খাটরা গ্রামে রাজা বল্লাল সেনের আমলে (১১০৯-১১৭৯ খ্রিষ্টাব্দ) সর্বপ্রথম হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জনবসতি গড়ে ওঠে বলে ঐতিহাসিকরা ধারণা করেন।
৪. গোপালগঞ্জ জেলার প্রধান কৃষি পণ্য ও রপ্তানি দ্রব্য কী কী?
এখানকার প্রধান কৃষি পণ্য হলো ধান, পাট, আখ ও বাদাম। জেলার প্রধান রপ্তানি পণ্য হিসেবে পাট ও তরমুজ সুপরিচিত।
৫. বিলুপ্তপ্রায় ফসল কোনগুলো?
গোপালগঞ্জ অঞ্চল থেকে চিনা, কাউন এবং আউশ ধানের মতো ঐতিহ্যবাহী ফসলগুলো বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায়।
৬. বহলতলী মসজিদ কত সালে নির্মিত হয়?
গোপালগঞ্জ জেলার অন্যতম প্রাচীন মুসলিম স্থাপত্য ‘বহলতলী মসজিদ’ ১৫৪৩ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত হয়।

মন্তব্য